চলতি অর্থবছরের বাজেটে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও ইনভার্টারের মতো সৌরবিদ্যুৎ উপকরণের ওপর শুল্ক ও কর ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হলেও সাধারণ ক্রেতারা এর সুফল পাচ্ছেন না। বাজারে এসব পণ্যের দাম কমার পরিবর্তে উল্টো চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে উচ্চমূল্যের কারণে বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
রাজধানীর গুলিস্তান, নবাবপুর ও কাপ্তান বাজারের মতো বড় বাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, করছাড়ের ঘোষণার কোনো ইতিবাচক প্রভাব খুচরা বাজারে পড়েনি। ক্রেতারা প্রত্যাশা করেছিলেন করছাড়ের ফলে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম সাশ্রয়ী হবে, কিন্তু বাস্তবে তাদের আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বাজারে বর্তমানে ৫৫০ ওয়াটের একটি সোলার প্যানেল ১৩ হাজার ৫০০ থেকে ১৯ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া ৫ কিলোওয়াটের একটি ইনভার্টারের দাম ৪৮ হাজার থেকে ৭৭ হাজার টাকা এবং ৫ দশমিক ১২ কিলোওয়াট-ঘণ্টার লিথিয়াম ব্যাটারির দাম ৯৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সোলার সিস্টেম বসাতে একজন ক্রেতাকে ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস আগেও যে ব্যাটারি ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়ে যাওয়ায় সৌরবিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ পর্যায়ে দামের এই ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের দেওয়া শুল্ক ও কর সুবিধার বড় অংশই মূলত নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রেসকো, ইপিসি এবং অনুমোদিত বড় প্রকল্পের জন্য সীমাবদ্ধ।
বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য একই ধরনের সুবিধা না থাকায় শুল্ক কমানোর সুফল খুচরা পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না। বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) জানিয়েছে, বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে লিথিয়াম ব্যাটারি ও মাউন্টিং স্ট্রাকচারের মতো পণ্যে মোট শুল্ক-কর প্রায় ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে, যেখানে রেসকো বা ইপিসি প্রকল্পের ক্ষেত্রে তা মাত্র ১৭ শতাংশ।
এছাড়া সোলার পিভি মডিউল আমদানিতে প্রতি কেজিতে ৩ মার্কিন ডলারভিত্তিক কাস্টমস মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে প্রকৃত করভার অনেক ক্ষেত্রে ২৮ থেকে ২৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। বিএসআরইএ এই পদ্ধতি বাতিল করে প্রকৃত ইনভয়েস মূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ জানান, সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে অন্তত দুই বছরের জন্য কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন।
এতে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে এবং উদ্যোক্তা তৈরি হবে। এনগ্রিন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল ইসলাম মনে করেন, সৌরবিদ্যুৎ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে কর অবকাশের পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান করা জরুরি। এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার সৌরপণ্য আমদানিতে দীর্ঘদিন ধরেই নীতি সহায়তা দিয়ে আসছে এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাওয়া গেলে তা বিবেচনা করা হবে।
বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেনের মতে, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ দূষণ রোধে সৌরবিদ্যুতের প্রসার অপরিহার্য।
তবে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎকে জনপ্রিয় করতে হলে বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়ে আর্থিক সহায়তা ও সহজ কিস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নেট মিটারিংভিত্তিক ৪ হাজার ৫৫১টি রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা রয়েছে, যার অধিকাংশ ঢাকা বিভাগে অবস্থিত।
এই খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নীতিগত সংস্কার ও খুচরা বাজারে দামের ভারসাম্য বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি।
