ভয়াবহ বন্যার কারণে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। দেশটির জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপাল থেকে বাংলাদেশে যে বিদ্যুৎ আসছিল তা এখন আর আসছে না। গত ২৭ আগস্ট সর্বশেষ ৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেপাল থেকে বাংলাদেশে এসেছিল।
তবে ওইদিন সন্ধ্যার পর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং এরপর থেকে আর কোনো বিদ্যুৎ বাংলাদেশে পৌঁছায়নি। নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধ হওয়ার বিষয়টি দেশটির গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে। সেখানে জানানো হয়েছে, ভারতের সঞ্চালনব্যবস্থা ব্যবহার করে নেপাল বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করত। কিন্তু নেপালের ভোটেকোশি নদী এলাকায় ভয়াবহ বন্যার কারণে দেশটির জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত ২৬ আগস্ট এই এলাকায় আঘাত হানা বন্যার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় নেপাল। এর ফলে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। নেপাল সাধারণত বর্ষা মৌসুমে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকে। বর্ষাকালে দেশটি গড়ে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করার সক্ষমতা অর্জন করেছিল।
তবে সাম্প্রতিক দুর্যোগের প্রভাবে সেই রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, রপ্তানির পরিমাণ কমে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছিল। নেপাল দীর্ঘ সময় ধরে শুষ্ক শীতের মাসগুলোতে বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি নিজেকে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে কাজ করছিল।
এই লক্ষ্য অর্জনের পথে নেপালের বিদ্যুৎ খাত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশটির বিদ্যুৎ রপ্তানি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য অনুমোদিত নেপালের দুটি প্রধান জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এই বন্যায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ২২ দশমিক ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং অন্যটি হলো ২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।
গত সপ্তাহ থেকে প্রকল্প দুটির বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এই প্রকল্পগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামগ্রিক রপ্তানি প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নেপালের বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পুনরায় সচল করতে কত সময় লাগবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভারতের সঞ্চালনব্যবস্থার মাধ্যমে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আসার প্রক্রিয়াটি সম্প্রতি শুরু হয়েছিল। এই নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে নেপালের বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই সরবরাহ ব্যবস্থা বর্তমানে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নেপালের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার পানি এবং এর ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নিরসনে কাজ চলছে।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো মেরামতের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে পুনরায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে না। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। নেপালের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সময়সীমা এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
ফলে বাংলাদেশে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আসার বিষয়টি আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধ হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ওপর কোনো দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা পর্যালোচনা করছেন। তবে বর্তমানে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আসা পুরোপুরি বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে এর প্রভাব পড়েছে।
