দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাস শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এই বিশাল অংকের ঋণ বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
ব্যাংকিং খাতের এই চিত্র দেশের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। সেই হিসেবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
মার্চ মাস শেষে মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ ছিল খেলাপি। অর্থাৎ, তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর মাস শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা।
সেই হিসেবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। দীর্ঘমেয়াদী হিসাব করলে দেখা যায়, গত বছরের জুন মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৬ হাজার ১২৭ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যাংক খাতে ঋণের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে বড় অঙ্কের ঋণ অনাদায়ী থাকা এবং বিভিন্ন সময়ে ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণের লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না। ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের মতো সুবিধাগুলো দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা, কিন্তু বাস্তবে এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতির ফলে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ঋণের শর্ত শিথিল করা, ঋণ আদায়ের জন্য কঠোর নির্দেশনা প্রদান এবং ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি বাড়ানো। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব উদ্যোগের এখনো কোনো দৃশ্যমান প্রভাব পড়েনি।
বরং জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়ে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়ার ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের আস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকগুলো তাদের আয়ের একটি বড় অংশ খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি হিসেবে রাখতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের মুনাফাকে সংকুচিত করছে। সামগ্রিকভাবে, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা এবং কঠোর তদারকি প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পাশাপাশি, বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে বকেয়া ঋণ আদায়ে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। খেলাপি ঋণের এই ক্রমবর্ধমান হার নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যতে কী ধরনের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তা এখন দেখার বিষয়।
