বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের প্রতিটি উপজেলায় ১০ জন করে তরুণ উদ্যোক্তাকে চিহ্নিত করে তাঁদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের একটি নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেক উদ্যোক্তা ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত তহবিল সুবিধা পাবেন। ‘উপজেলা ভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ নামের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো তৃণমূল পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এই কর্মসূচির জন্য ৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল অনুমোদন করেছে। এই তহবিলের অর্ধেক বা ২৫০ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক জোগান দেবে এবং বাকি ২৫০ কোটি টাকা বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক সরবরাহ করবে। কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি জেলায় একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক এই কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে।
উদ্যোক্তা নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা অফিস, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সমন্বয়ে সম্পন্ন হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক খাতের ধরন অনুযায়ী পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া হবে। এই ঋণের সুদের হার হবে ৪ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে। ঋণের পাশাপাশি উদ্যোক্তারা শর্তসাপেক্ষ অনুদানও পাবেন, যা ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে প্রদান করা হবে।
অনুদানের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হলে তা আর ফেরত দিতে হবে না। তবে অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হলে সেই অনুদান ঋণে রূপান্তরিত হবে। প্রাথমিকভাবে দেশের ৮টি বিভাগের ৮টি জেলায় এই কর্মসূচি পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা হবে। এই পর্যায় সফল হলে পরবর্তীতে তা দেশের সব জেলা ও উপজেলায় সম্প্রসারণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৫০৩টি উপজেলা রয়েছে। সেই হিসেবে মোট ৫ হাজার ৩০ জন তরুণ উদ্যোক্তাকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের গত ৩০ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে তরুণদের ভূমিকা অপরিসীম।
অনেক তরুণ উদ্যোক্তার উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণা থাকলেও মূলধনের অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে তাঁরা ব্যবসা শুরু করতে পারেন না। এই সংকট নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করবে। উদ্যোক্তাদের আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই এবং ব্যবসায়িক সম্ভাব্যতা মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের নির্বাচন করা হবে।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে উদ্যোক্তারা শুধু প্রাথমিক মূলধনই পাবেন না, বরং তাঁদের ব্যবসায়িক পরামর্শ এবং প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগও দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা আরও জানান, অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা সঠিক দিকনির্দেশনা ও অর্থায়নের অভাবে ঝরে পড়েন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে ব্যবসা টেকসই করার চেষ্টা করা হবে।
কর্মসূচির প্রশাসনিক ব্যয় এবং উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির খরচ বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএমএসএমই তহবিল থেকে বহন করা হবে। উদ্যোক্তা অর্থায়ন বিষয়ক পরামর্শক শওকত হোসেন এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, এই কর্মসূচির সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করছে স্বচ্ছ নির্বাচনের ওপর। অতীতে ইইএফ তহবিলের মাধ্যমে অর্থায়নের ক্ষেত্রে অনিয়মের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার যোগ্য ব্যাংকগুলোকে নির্বাচনের দায়িত্ব দিতে হবে।
এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে উদ্যোক্তা নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি। ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খানও একই মত প্রকাশ করেছেন। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, উদ্যোক্তাদের নির্বাচনের পর যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে এবং অনুদানের অর্থ ধাপে ধাপে প্রদান করা উচিত। এতে অর্থের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে এবং উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পাবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই কর্মসূচির মাধ্যমে যদি অর্ধেক উদ্যোক্তাও সফলভাবে গড়ে ওঠে, তবে তা দেশের অর্থনীতির চিত্র বদলে দিতে সক্ষম হবে।
