দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি কোম্পানিকে ভালো বা মানসম্পন্ন হিসেবে অভিহিত করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি জানিয়েছেন, বাজারে অনেক কোম্পানি থাকলেও বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল ও মানসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। শুক্রবার ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের সদস্যদের জন্য আয়োজিত এক আবাসিক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি এমন যে, বিনিয়োগকারীরা ভালো কোম্পানি খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাজারে থাকা বাকি কোম্পানিগুলোর আয়ের ধারা স্থিতিশীল নয় এবং এগুলোতে আয়ের ওঠানামা অনেক বেশি। কোনো কোম্পানির আয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অস্থিরতা থাকলে তাতে আর্থিক ঝুঁকিও বেশি থাকে। তাই পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী ও বিনিয়োগবান্ধব করতে হলে মানসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানো অপরিহার্য।
তিনি পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থাকে একটি ইংরেজি কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে তুলনা করে বলেন, চারদিকে পানি থাকলেও যেমন তৃষ্ণার্ত মানুষের পান করার মতো পানি থাকে না, পুঁজিবাজারেও তেমনি অনেক কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগযোগ্য ভালো কোম্পানির অভাব রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও কার্যক্রম ধীরগতিতে চলায় বাজারে ভালো কোম্পানির সরবরাহ বাড়েনি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই সংকট নিরসনে বিএসইসি চেয়ারম্যান সরাসরি তালিকাভুক্তি বা ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতি কার্যকর করার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি জানান, আইপিও প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় ভালো কোম্পানিগুলোকে দ্রুত বাজারে আনার লক্ষ্যে ডিরেক্ট লিস্টিং বিধিমালা নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আইপিও প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করতে বর্ধিত অডিট বা এক্সটেন্ডেড অডিট ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের।
বর্তমানে প্রচলিত অডিটে কেবল আর্থিক বিবরণী যাচাই করা হয়, কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় কোম্পানির জমি, যন্ত্রপাতি, মজুত পণ্য এবং সরবরাহকারীসহ বিভিন্ন সম্পদের বাস্তব অস্তিত্ব যাচাই করা হবে। এতে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং বারবার প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন কমবে। ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আকৃষ্ট করতে হাইব্রিড ব্যবস্থার প্রবর্তনের কথাও জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।
এই ব্যবস্থায় কোম্পানিগুলো একই সঙ্গে মূলধন সংগ্রহ এবং সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে, যা বিশেষ করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য সহায়ক হবে। তিনি বলেন, বহুজাতিক ও বড় স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করা হবে এবং প্রয়োজনে আইনের ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে। সিকিউরিটিজ আইনের ২০এ ধারার আওতায় জনস্বার্থে কোনো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ভবিষ্যতে পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানির সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বড় ও ফ্ল্যাগশিপ কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনার প্রক্রিয়া জোরদার করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে দেশের অনেক বড় কোম্পানি পুঁজিবাজারে যুক্ত হবে। তালিকাভুক্তির সুবিধা সম্পর্কে তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে আসার ফলে কোম্পানির করপোরেট ইমেজ বৃদ্ধি পায় এবং শেয়ারের একটি বাজারমূল্য তৈরি হয়।
এছাড়া পারিবারিক ব্যবসায় উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে তালিকাভুক্তি একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। শেয়ারের বাজারমূল্য থাকায় বিনিয়োগকারীরা সহজেই মালিকানা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পান। তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির করহারে যৌক্তিক পার্থক্য তৈরির বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও তিনি জানান। বিএসইসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল লক্ষ্য সূচকের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল, ন্যায্য ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজার গড়ে তোলা।
বাজারের উত্থান-পতন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তবে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের মাধ্যমে বাজারের ভিত মজবুত করাই কমিশনের প্রধান কাজ। আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারের চিত্র ইতিবাচকভাবে বদলে যাবে এবং বর্তমান দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
