দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার মাদরাসাছাত্র মিনহাজ উদ্দিন শখের বশে রঙিন তরমুজ চাষ শুরু করে এখন একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করে তিনি প্রথমবারেই লাখপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। তার উৎপাদিত রঙিন তরমুজ এখন দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন সুপারশপে নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে।
মিনহাজ উদ্দিন বোচাগঞ্জ উপজেলার ৬ নম্বর রণগাঁও ইউনিয়নের চন্ডিপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফার সন্তান। আলিম পরীক্ষা শেষ করার পর তিনি শখের বশে মাত্র দুই প্যাকেট তরমুজের বীজ সংগ্রহ করে চাষাবাদ শুরু করেন। প্রথমবার ভালো ফলন পাওয়ার পর তার আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়। পরবর্তীতে তিনি উপজেলা কৃষি অফিসের সাথে যোগাযোগ করেন এবং কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ৫০ শতক জমিতে বাণিজ্যিকভাবে রঙিন তরমুজ চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
এই তরুণ উদ্যোক্তা নিজের অর্থায়নে মালচিং পদ্ধতিতে মাচায় দুই জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। এর মধ্যে ‘সূর্য ডিম’ নামের হলুদ রঙের তরমুজটি তিনি বাইরে থেকে বীজ সংগ্রহ করে নিজ উদ্যোগে চাষ করেছেন। অন্যদিকে ‘মার্সেলো’ জাতের কালো তরমুজটি উপজেলা কৃষি অফিসের সরকারি একক ফল বাগান প্রদর্শনীর আওতায় চাষ করা হয়েছে।
৫০ শতক জমি লিজ নেওয়া এবং আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে মিনহাজের মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এরই মধ্যে তিনি দুই লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি কেজি তরমুজ ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলন ও বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে সব মিলিয়ে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার তরমুজ বিক্রির আশা করছেন তিনি।
মিনহাজ উদ্দিন জানান, শুরুতে সুপারশপগুলো তার উৎপাদিত তরমুজ কিনতে আগ্রহী ছিল না। তবে স্থানীয় বাজারে চাহিদা তৈরি হওয়ার পর ব্যবসায়ীরা নিজেরাই তার সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। বর্তমানে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন সুপারশপ তার নিয়মিত গ্রাহক। তার এই সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে স্থানীয় স্কুলছাত্র ডালিমসহ অনেকে তার বাগানে কাজ শিখছেন এবং উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
স্থানীয় ফল ব্যবসায়ীরা জানান, দিনাজপুর অঞ্চলে বর্তমানে ফলের উৎপাদন কম থাকায় এই রঙিন তরমুজের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। শুষ্ক আবহাওয়া ও মাটির গুনাগুণের কারণে এই তরমুজগুলো স্বাদে, গন্ধে ও মিষ্টিতে অনন্য। বোচাগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দিনাজপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ‘রণগাঁও টেকসই কৃষি উন্নয়ন কৃষক গ্রুপ’-এর মাধ্যমে সরকারি একক ফল বাগান প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার নয়ন কুমার সাহা জানান, প্রকল্পের আওতায় মিনহাজ উদ্দিনকে বীজ, সারসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা তাকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, শিক্ষিত তরুণরা কৃষিকে শুধু পেশা হিসেবে নয়, বরং উদ্যোক্তা হওয়ার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন।
আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ কাজে লাগাতে পারলে কৃষিতে তরুণদের জন্য বড় ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মারুফ হাসান জানান, চাকরির অপেক্ষায় না থেকে মিনহাজের মতো শিক্ষিত তরুণদের কৃষি ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার উদ্যোগ স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
মিনহাজ উদ্দিনের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে কৃষিখাতকে লাভজনক পেশায় রূপান্তর করা সম্ভব।
