বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাস শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি।
২০২৬ সালের মার্চ মাস শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল।
খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে বাংলাদেশের পরেই রয়েছে চাদ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, আলজেরিয়া ও ঘানা। চাদে খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনিতে ৩০ শতাংশ, আলজেরিয়ায় ২০ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এবং ঘানায় ১৮ দশমিক ১১ শতাংশ। অতীতে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন খেলাপি ঋণের তালিকায় শীর্ষে থাকলেও, বর্তমানে দেশটি সফলভাবে এই হার কমিয়ে এনেছে।
ইউক্রেন তাদের পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন, ঋণ আদায় এবং নতুন ভালো মানের ঋণ বিতরণের মাধ্যমে এই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে খেলাপি ঋণের হার কমে ১২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন বিশেষ ছাড়, ঋণ পুনঃ তফসিল এবং হিসাবগত কৌশলের মাধ্যমে অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণকে নিয়মিত দেখানো হয়েছিল। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় সেই অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে এসেছে।
ফলে আগে আড়ালে থাকা বিপুল পরিমাণ ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক, যেখানে বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে পড়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণ খেলাপি।
রাজনৈতিক প্রভাবে ভুয়া ও বেনামি ঋণ প্রদান, দুর্বল তদারকি, ব্যবসায়িক মন্দা এবং জ্বালানিসংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি রাখার নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে।
ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করার ফলে আগে নিয়মিত দেখানো অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করেছে যে, কঠোর শ্রেণীকরণ নীতি ও সম্পদের মান পর্যালোচনার ফলে ভবিষ্যতে আরও খেলাপি ঋণ বেরিয়ে আসতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সম্পদ জব্দ করা, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করা এবং ব্যাংকের ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ করা প্রয়োজন।
এছাড়া নতুন করে খারাপ ঋণ সৃষ্টি রোধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। কেবল পুনঃ তফসিল বা বিশেষ সুবিধা দিয়ে সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণের হার কমানো সম্ভব হলেও, এটি ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সমাধান করবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
