ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইরানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক আরও জোরদার ও বহুমুখী করার ঘোষণা দিয়েছেন। গত ৩১ আগস্ট কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রেক্ষাপটে দুই নেতার এই বৈঠক আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বৈঠকে নরেন্দ্র মোদী ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, আগামী দিনগুলোতে ভারত ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্যিক পণ্যের পরিধি বাড়ানো এবং তা বহুমুখী করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হবে। এছাড়া আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
নরেন্দ্র মোদী উল্লেখ করেন, এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য যেকোনো ধরনের গঠনমূলক প্রচেষ্টাকে ভারত সমর্থন করবে। তবে বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ে বিস্তারিত কোনো কর্মপরিকল্পনা বা কৌশল সম্পর্কে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেননি। ঐতিহাসিকভাবে ভারত ও ইরানের মধ্যে শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে তা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৭ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে তা কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ সম্প্রতি ইরানকে বাণিজ্যিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামক একটি কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান শুরু করেছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এমন ঘোষণা দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি এ বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী মূলত বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো মাথায় রেখেই নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনাগুলো খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, অর্থায়ন, বিমা, পরিবহন এবং লজিস্টিক ব্যবস্থার মতো জটিল বিষয়গুলো বিবেচনা করেই এই বাণিজ্য সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজতে হবে।
বর্তমানে ভারত ও ইরানের মধ্যকার বাণিজ্য মূলত বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত হয়, যেখানে আন্তর্জাতিক আর্থিক বিধিনিষেধের বাস্তবতাকে মোকাবিলা করতে হয়। বৈঠকে চাবাহার বন্দরের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। এই কৌশলগত বন্দরটির সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিক্রম মিশ্রি জানান, চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সুবিধা বজায় রাখার জন্য ভারত বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, চাবাহার বন্দরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড়ের মেয়াদ গত ২৬ এপ্রিল শেষ হয়েছে, যার ফলে ভারত বন্দর পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কাটিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ইরান আশাবাদী। বিশকেকে অবস্থানকালে নরেন্দ্র মোদী রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এটি ছিল চলতি বছরে দুই নেতার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব জানান, বৈঠকে দুই নেতা ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বিশেষ করে, ভারত রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করায় এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে। উভয় পক্ষই এই ঘাটতি নিরসনে রাশিয়ায় ভারতীয় পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। গত বছর প্রেসিডেন্ট পুতিনের ভারত সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদী রাশিয়ায় ভারতীয় পণ্যের বাজারজাতকরণে বিদ্যমান বাধাগুলো নিয়ে একটি নথি হস্তান্তর করেছিলেন।
সেই নথিতে উল্লিখিত সমস্যাগুলোর মধ্যে কিছু বিষয়ের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে, ভারত তার ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় ইরান ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল অব্যাহত রেখেছে।
