আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম গত আগস্ট মাসে প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি বড় ধরনের দরপতনের পর মূল্যবান এই ধাতুর বাজার পুনরায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৭০০ ডলার অতিক্রম করেছিল। বর্তমানে বিশ্ববাজারে সোনার এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে মার্কিন ডলারের মান কমে যাওয়া, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সুদের হার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা প্রধান ভূমিকা পালন করছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সৃষ্ট উদ্বেগও সোনার চাহিদাকে প্রভাবিত করছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার আকর্ষণ আবারও বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম আরও এক শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। এদিন বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে স্পট সোনার দাম ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৪৩৪ দশমিক ৭০ ডলারে পৌঁছায়।
এর আগের দিন বুধবার সোনার দাম প্রায় এক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচারের দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৪৮০ দশমিক ১০ ডলারে উন্নীত হয়। আগস্ট মাসে দাম বাড়লেও সোনা এখনো চলতি বছরের জানুয়ারিতে অর্জিত রেকর্ড উচ্চতার চেয়ে প্রায় ১৮ শতাংশ নিচে অবস্থান করছে।
জানুয়ারির সর্বোচ্চ দাম থেকে জুলাই মাসের সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত সোনার দাম ২৫ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছিল। সেই সময় ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা অন্যান্য চাপের মুখে থাকা সম্পদের মার্জিন জোগাতে সোনা বিক্রির দিকে ঝুঁকে পড়েন, যার ফলে দামের বড় পতন ঘটেছিল।
তবে বর্তমানে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মূল লক্ষ্য ছিল দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমানো। উল্লেখ্য, সম্প্রতি এসব বন্ডের সুদ ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। বন্ড কেনার ঘোষণার পর সুদের হার কিছুটা হ্রাস পায় এবং মার্কিন ডলার দুর্বল হয়ে পড়ে।
এতে সোনার মতো সীমিত সরবরাহের সম্পদের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। বিশ্লেষকেরা একে ‘ডিবেসমেন্ট ট্রেড’ হিসেবে অভিহিত করছেন, যার অর্থ হলো সরকারি ঋণ বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে মুদ্রার মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পেতে সোনা বা বিটকয়েনের মতো সম্পদে বিনিয়োগ করা। ভ্যানএক-এর স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতুবিষয়ক পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক ইমারু কাসানোভা জানিয়েছেন, ট্রেজারির বন্ড কেনার পরিকল্পনা সোনার দামের নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
এই ঘোষণার পর এক সপ্তাহে মার্কিন ডলার সূচক প্রায় দশমিক ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং সোনার দাম পাঁচ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ফেডারেল রিজার্ভের নীতি সোনার দামের ক্ষেত্রে বিপরীত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। জ্যাকসন হোল অর্থনৈতিক সম্মেলনে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
বাজার তার এই বক্তব্যকে তুলনামূলক কঠোর হিসেবে বিবেচনা করছে, যার ফলে ডলার ও প্রকৃত সুদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সোনার দাম চাপের মুখে পড়েছে। সোনার দাম বাড়ার পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর চাহিদাও একটি বড় কারণ। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ২৮৯ টন সোনা কিনেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬২ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে চীন সোনা কেনা অব্যাহত রেখেছে এবং পোল্যান্ড সবচেয়ে বেশি সোনা সংগ্রহ করেছে। আগামী ১২ মাসেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এই সোনা কেনার প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের চাহিদার পরিবর্তনের ফলে জুলাই মাসে বৈশ্বিক গোল্ড ইটিএফে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের নিট বিনিয়োগ এসেছে।
ইউবিএস গ্লোবাল ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা মার্ক হেফেল পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, আগামী ১২ মাসে সোনার দাম প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৪০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। সরকারগুলোর ঋণের বোঝা বৃদ্ধি এবং তা পরিশোধের অনিশ্চয়তা মূল্যবান ধাতুর জন্য সহায়ক হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে সোনার বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই মার্কিন ডলারের শক্তি এবং সুদের হারের ওপর নির্ভরশীল।
ডলার দুর্বল হলে এবং প্রকৃত সুদের হার কমে গেলে সোনার দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ফেডারেল রিজার্ভ কঠোর অবস্থানে থাকলে এবং ডলার শক্তিশালী হলে সোনার দাম পুনরায় চাপের মুখে পড়তে পারে। ফলে বিশ্ববাজারে সোনার দামে বড় ধরনের উত্থান-পতনের সম্ভাবনা বজায় রয়েছে।
